সোল্ডারিং কলা কৌশল

ভূমিকাঃ

ইতোপূর্বে ইলেকট্রনিক বিষয়ে কিছু পোষ্ট লিখেছি, তার মধ্যে কিছু রয়েছে তত্ত্বভিত্তিক এবং কিছু রয়েছে প্রজেক্ট ভিত্তিক। প্রজেক্ট হচ্ছে সেই সকল বিষয় যাতে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বীয় জ্ঞান কাজে লাগিয়ে হাতে কলমে কোন যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ তৈরী করা হয় ও যার ব্যবহারিক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আউটপুট থাকে এবং কোন না কোন ভাবে মানব জীবনের কল্যাণে ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভবনা থাকে। বিজ্ঞান মনস্ক ও সৃজনশীল মেধার অধীকারী যে কেউ এমন কাজে আগ্রহী হতে চাবে। এরূপ আগ্রহী ও মেধাবী নবীনরা যখন সাহস করে প্রজেক্ট তৈরীর কাজ শুরু করে তখন হয় আর এক বিপদ, একরাশ সমস্যা তাদের ঘিরে ধরে, যেমনঃ সোল্ডারিং করতে না জানা কিংবা অদক্ষ সোল্ডারিং, পিসিবির কপার ট্রেসগুলি শর্ট করে ফেলা, অতিরিক্ত তাপ প্রয়োগের ফলে কপার ট্রেস তুলে ফেলা, অমসৃন ও খসখসে শুষ্ক সোল্ডারিং। এছাড়াও রয়েছে হাজারো সমস্যা যেমন বাজারে পার্টের/যন্ত্রাংশের অপ্রাপ্যতা, হ্যান্ড টুলসের অভাব, অর্থনৈতিক অভাব ইত্যাদি। এত সব সমস্যার চাপে পড়ে নবীনদের সাধের প্রজেক্ট অবশেষে ভেস্তে যায়। যাই হোক শত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা এগিয়ে যেতে চাই, সেই উদ্দেশ্যেই আজ সোল্ডারিং বিষয়ে তত্ত্ব ও তথ্য ভিত্তিক আলোচনার ইচ্ছা পোষণ করি। আশা করছি সমূহ সমস্যার মধ্য হতে অন্তত একটি সমস্যার অবসান হবে, অভিজ্ঞদের জ্ঞান শাণিত হবে আর নবীনরা প্রথমিক ধারণা পেয়ে কাজ শুরু করতে পারবে।

সোল্ডারিং কি?

সোল্ডারিং হলো একটি বিশেষ প্রকৃয়া যার সাহায্যে দুই বা ততোধিক ধাতব উপাদানকে যুক্ত করে সংযোগ সৃষ্টি করা হয় এবং এই কাজের জন্য সাহায্যকারী হিসাবে একটি (Filler Metal) ফিলার ধাতব উপাদান ব্যবহৃত হয় যাকে বিগলিত অবস্থায় সংযোগস্থলে প্রবাহের মাধ্যমে সংযোগ সৃষ্টি হয়।

সোল্ডারিং ও ওয়েলডিং প্রকৃয়ার পার্থক্যঃ

সোল্ডারিং প্রকৃয়ার মাধ্যমে দুটি ধাতব টুকরোকে জোড়া লাগানো যায় বটে কিন্তু সোল্ডারিংকে ওয়েলডিং বলা যায় না কারন সোল্ডারিং ও ওয়েলডিং প্রকৃয়ার মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান আর তা হলো ওয়েলডিং প্রকৃয়ায় ফিলার ও ওয়ার্কপিছ উভয়ের গলনের মাধ্যমে সংযোগ সৃষ্টি হয় কিন্তু সোল্ডারিং এ শুধুমাত্র ফিলার মেটালের গলনের মাধ্যমে সংযোগ সৃষ্টি হয় ওয়ার্কপিছের গলন সম্পন্ন হয়না। ফিলার ধাতব উপাদানগুলি সাধারনতঃ ওয়ার্কপিচ (workpiece) অপেক্ষা নিম্ন গলনাংক বিশিষ্ট হয় তাই ওয়ার্কপিছ গলনের প্রয়োজন হয় না।

ফিলারঃ

সোল্ডারিং করার জন্য নিম্ন গলনাংক বিশিষ্ট ধাতব পদার্থ ব্যবহৃত হয় যেমনঃ সোল্ডার যাকে স্থানীয় ভাষায় রাং বলা হয় এগুলিকে ফিলার (Filler Metal) বলে।

ওয়ার্কপিচঃ

যে ধাতব পদার্থ সমূহকে জোড়া লাগানো হয় তাদের (workpiece) বলে। ইলেকট্রনিক সোল্ডারিং এর ক্ষেত্রে কম্পোনেন্টের টার্মিনাল এবং পিসিবির কপার ট্রেসকে (workpiece) বলা হয়।

সোল্ডারিং করার প্রয়োজনীয়তা কি?

একটি ইলেকট্রনিক প্রজেক্টে বহু সংখ্যক কম্পোনেন্ট ব্যবহৃত হয়। এই কম্পোনেন্টসমূহকে বর্তনীর সাথে যথাযথভাবে সংযুক্ত করার প্রয়োজন পড়ে। আমরা বিভিন্ন ভাবে এই কম্পোনেন্টসমূহকে বর্তনীতে যুক্ত করতে পারি, যেমনঃ তার দিয়ে শক্ত করে বেধেঁ, ক্লিপ দিয়ে আটকে, দুটি তারকে পেচিয়ে যুক্ত করে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু যত শক্ত করেই সংযোগ করিনা কেন তা কোন এক সময় ঢিলা হতে বাধ্য কিংবা সংযোগস্থল দীর্ঘদিন বাতাসের সংস্পর্শে থাকায় তাতে ধাতব অক্সাইড জমা হওয়ার কারণে সংযোগে অপরিবাহীতা সৃষ্টি হয়। কিন্তু ইলেকট্রনিক প্রজেক্টের শত শত সংযোগের মধ্যে একটি সংযোগও যদি এরূপ ঢিলা বা অপরিবাহী হয় থাকলে প্রজেক্ট সঠিক ভাবে কাজ করবে না। তাই প্রজেক্টের জন্য প্রয়োজন কার্যকরী, দৃঢ়, মজবুত, দীর্ঘস্থায়ী বৈদ্যূতিক সংযোগ পদ্ধতি যা উপরোক্ত সীমাবদ্ধতাসমূহ হতে সম্পূর্ণ মুক্ত। সোল্ডারিং এমন একটি আদর্শ বৈদ্যূতিক সংযোগ পদ্ধতি যাতে সংযোগস্থলে লুজ কন্ডাকশন/ঢিলা সংযোগ সৃষ্টির কোন সুযোগ নেই বরং তা দৃঢ় মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী একটি প্রকৃয়া। বর্তমানে ইলেকট্রনিক যন্ত্রংশের বর্তনী তৈরীতে প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড (PCB) ব্যবহার হয় যার তল বা পৃষ্ঠে বহু সংখ্যক কপার ট্রেস থাকে যা সংযোগকারী তার হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এই সকল কপার ট্রেসের সাথে কম্পোনেন্টসমূহকে বৈদ্যূতিকভাবে যুক্ত করার জন্য সোল্ডারিং একটি আদর্শ ও অদ্বিতীয় পদ্ধতি।

ব্যবহারঃ

সোল্ডারিং প্রযুক্তি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার হয় যেমন প্লাম্বিং কাজে, জুয়েলারি সামগ্রীতে ধাতব জোড়া সৃষ্টিতে, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশে কম্পোনেন্ট সংযোগের কাজে। তবে আমরা শুধুমাত্র সোল্ডারিংয়ের ইলেকট্রনিক প্রযুক্তিগত প্রয়োগ নিয়েই পরবর্তী আলোচনা করব।

সেল্ডারিং করার উপাদানঃ

সোল্ডারিং কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে যে সকল যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল প্রয়োজন হয় তাই সোল্ডারিং করার উপাদান। নিম্নে তা উল্লেখিত হলোঃ

১। সোল্ডারিং আয়রন (স্থানীয় ভাষায় তাঁতাঁল)/সোল্ডারিং স্টেশন

২। ফিলার ম্যাটেরিয়াল বা সোল্ডার যাকে স্থানীয় ভাষায় রাং বলা হয়

৩। সোল্ডারিং ফ্লাক্স (পেস্ট অথবা গাম রজন)

৪। ওয়ার্কপিচ (পিসিবি ও সার্কিট কম্পোনেন্ট)

৫। টুইজার, ব্লেড, কাটিং প্লায়ার

১। সোল্ডারিং আয়রনঃ

সোল্ডারিং আয়রন একটি হ্যান্ডটুল যা সোল্ডারিং করার কাজে ব্যবহৃত হয়। ইহা সোল্ডারিং সারফেসে প্রয়োজনীয় তাপ সরবরাহ করে যাতে ফিলার মেটাল গলনের মাধ্যমে ওয়ার্কপিচ সমূহের সংযোগ পয়েন্টে প্রবাহিত হয়ে শক্ত বৈদূতিক সংযোগ সৃষ্টি করে।

1IRON

চিত্রে সোল্ডারিং আয়রনের বাহ্যিক গঠন দেখানো হয়েছে। একটি সোল্ডারিং আয়রনে একটি টিপ থাকে যাকে অনেকে বিট বলে থাকেন, তাপোৎপাদী উপাদান বা কয়েলের ধারক থাকে এবং এর অভ্যন্তরে কয়েল থাকে, একটি তাপরোধী হাঁতল থাকে এবং বিদ্যূৎ সরবরাহের জন্য তার সহ প্লাগ থাকে। প্লাগটিকে বিদ্যূৎ সরবরাহের সাথে যুক্ত করলে কয়েল তার ক্ষমতানুযায়ী কারেন্ট গ্রহন করে উত্তপ্ত হয় ফলে কয়েলের সংস্পর্শে থাকা আয়রনের বডি ও টিপ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় আয়রনের তাপরোধী হাতল ধরে কাজ করতে হয়।

2SIFT

সোল্ডারিং আয়রনের একটি গুরুত্ত্বপূর্ণ অংশ হলো এর টিপ। আয়রনের টিপটি খুলে পরিবর্তন যোগ্য। টিপ বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে, যেমন সূঁচালো টিপ, কোনিক্যাল টিপ, চিজেল বা চ্যাপ্টাকৃতি টিপ। এদের সবগুলি আবার চিকন ও মোটা উভয় প্রকৃতির রয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন ধরনের টিপ বিভিন্ন কাজের জন্য সুবিধাজনক, যেমন সূঁচালো চিকন টিপ পিসিবির সূক্ষ ট্রেস ০.২৫ মিঃমিঃ হতে ০.৫ মিঃমিঃ এর জন্য প্রযোজ্য এই ধরনের টিপ দ্বারা সাধারণত আইসির পিনসমূহ সোল্ডারিং করা হয় এবং সোল্ডার হিসাবে ০.২৫ মিঃমিঃ হতে ০.৫ মিঃমিঃ ব্যসের সোল্ডার ব্যবহার করা হয়। সূঁচালো টিপগুলির একটি সুবিধা হলো এগুলি দ্বারা অল্প স্থানে সুক্ষ সোল্ডারিং করা যায় এবং পাশাপাশি ট্রেসগুলি পরস্পর শর্ট হয়ে যায়না। তাই যেখানে সূক্ষ সোল্ডারিং করার প্রয়োজন সেখানে সূঁচালো চিকন টিপ নির্বাচন করতে হবে। সূঁচালো ও মোটা অথবা কোনিক্যাল ও চিকন টিপগুলি সাধারণ ইলেকট্রনিক কম্পোনেন্টসমূহ ডায়োড, ক্যাপাসিটর, রেজিস্টর ইত্যাদি সোল্ডারিং করার কাজে ব্যবহার হয়। কোনিক্যাল ও মোটা টিপগুলি সাধারণতঃ মোটা কম্পোনেন্টের টার্মিনাল বা যেখানো বেশী পরিমান সোল্ডার গলানোর প্রয়োজন হয় সেখানে ব্যবহার হয়। চ্যাপ্টা বা চিজেল আকৃতির (Chisel Shaped) টিপসমূহ দ্বারা সোল্ডার ছড়ানো সুবিধাজনক তাই যেখানে সোল্ডার ছড়ানো প্রয়োজন সেখানে চ্যাপ্টাকৃতির টিপ ব্যবহার করুন। চ্যাপ্টা ও মোটা টিপগুলি সাধারণতঃ বড় ডিভাইসের মোটা টার্মিনাল যেখানে বেশী তাপের প্রয়োজন হয় ও বেশী সোল্ডার ছড়ানোর প্রয়োজন হয় সেখানে ব্যবহার করা হয়। আপনার সোল্ডারিং এর ধরণ বুঝে বেছে নিন আপনার টিপ।

3

সোল্ডারিং আয়রনসমূহ বিভিন্ন ক্ষমতা (ওয়াট) এর হয়ে থাকে। বেশী ক্ষমতা সম্পন্ন আয়রন বেশী কারেন্ট খরচ করে এবং বেশী উত্তপ্ত হয় এবং কম ক্ষমতা সম্পন্ন আয়রন কম কারেন্ট খরচ করে এবং কম উত্তপ্ত হয়। সূক্ষ সোল্ডারিং এর জন্য কম তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়, এজন্য ২৫ থেকে ৩৫ ওয়াটের আয়রন যথেষ্ট। সাধারণ কাজের জন্য ৩৫ থেকে ৪৫ ওয়াটের আয়রন যথেষ্ট। যদি ভারি সোল্ডারিং করার প্রয়োজন অর্থাত মোটা টার্মিনাল এবং বেশী সোল্ডার গলানোর প্রয়োজন পড়ে তাহলে বেশী ক্ষমতার আয়রন ৬০ থেকে ৮০ ওয়াট আয়রন ব্যবহার হয়। আপনার কাজের ধরণ বুঝে বেছে নিন আপনার আয়রন।

আধুনিক সোল্ডারিং স্টেশনঃ

সোল্ডারিং স্টেশন বর্তমান সময়ের আধুনিক সোল্ডারিং সিস্টেম। এর সাথে সোল্ডারিং আয়রন রয়েছে, হট এয়ার গান রয়েছে এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা রয়েছে। সোল্ডারিং স্টেশনগুলির একটি বড় সুবিধা হলো এর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রক নবটি ঘুরিয়ে/পরিবর্তন করে আপনার কাজের জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা নির্বাচন করতে পারবেন।

4

এছাড়া যে সকল সুক্ষ স্থানে সোল্ডারিং আয়রন ব্যবহার করা যায়না সেথায় সোল্ডারিং ও ডিসোল্ডারিং করার জন্য হট এয়ার গান খুবই উপযোগী। এয়ারগান হতে নির্গত গরম বাতাস সহজেই সোল্ডারকে গলিয়ে সোল্ডারিং ও ডিসোল্ডারিং সম্পন্ন করে।


২। ফিলারঃ

সোল্ডারিং কাজে ব্যবহৃত মেলটিং উপাদানকে ফিলার (Filler Metal) বলে। অর্থাত যে ধাতুকে গলনের মাধ্যমে অপর দুটি ধাতুকে জোড়া লাগানো হয় তাকে ফিলার বলে। ফিলারের গলনাংক ওয়ার্কপিচসমূহ হতে কম হয়ে থাকে। ইলেকট্রনিক কাজে ব্যবহৃত ফিলার উপাদানকে সোল্ডার বলা হয়।

5

চিত্রে সোল্ডার দেখানো হলো। সোল্ডার একটি (Metal Alloy) ধাতব মিশ্রণ বা সংকর ধাতু। দেখতে রূপালী বর্ণের, খুবই নমনীয় ও বিদ্যূৎ সু-পরিবাহী পদার্থ। বাজারে যে সোল্ডার পাওয়া যায় তা দেখতে অনেকটা বৈদ্যূতিক তারের মত। ইলেকট্রনিক কাজে যে বিশেষ সোল্ডার ব্যবহার করা হয় তা সাধারণতঃ দুটি ধাতুর মিশ্রণ আর তা হলো টিন (Sn) ও সীসা (Pb)। এই টিন ও সীসাকে বিভিন্ন অনুপাতে মিশিয়ে সোল্ডার তৈরী করা হয়। অনুপাতকে সর্বদা টিন/সীসা এভাবে প্রকাশ করা হয় অর্থাত ৬০/৪০ এর অর্থ হলো ৬০% টিন এবং ৪০% সীসা। এখন প্রশ্ন হলো টিন ও সীসা কেন মিশ্রণ করা হয়। কারন সোল্ডারের গলনাংক কমানোর জন্য। বিষয়টি আমরা একটি গ্রাফ চিত্র হতে বুঝার চেষ্টা করি। নিম্নে একটি গ্রাফ চিত্র দেখানো হয়েছে। চিত্রে X – অক্ষ বরাবর টিন/সীসার অনুপাত দেখানো হয়েছে এবং Y- অক্ষ বরাবর মিশ্রনের গলনাংক তাপমাত্রা দেখানো হয়েছে। চিত্রের সর্ব বামে দেখা যায় ১০০% বিষুদ্ধ সীসার গলনাংক ৬২১ ডিগ্রি ফারেনহাইট এবং সর্ব ডানে ১০০% বিষুদ্ধ টিনের গলনাংক ৪৫০ ডিগ্রি ফাঃ। কিন্তু মজার বিষয় হলো ধাতু দুটির কিছু নির্দিষ্ট অনুপাতের গলনাংক উভয় বিষুদ্ধ ধাতু অপেক্ষা কম হয় আর তা হলো ৫০/৫০, ৬০/৪০, ৭০/৩০, ৮০/২০, ৯০/২০ অনুপাতসমূহ। আর একটি অনুপাত রয়েছে যার গলনাংক সর্বনিম্ন তা হলো ৬৩/৩৭ ও গলনাংক ৩৬১ ডিগ্রি ফাঃ এবং এর কোন প্লাস্টিক পয়েন্ট নেই তাই এটি সবচেয়ে কম তাপমাত্রায় গলে আর ঠান্ডা হওয়ার সময় খুব দ্রুত জমে শক্ত হয় ফলে এটি আদর্শ সোল্ডার, তবে এটি বেশ দামী বা ব্যয়বহুল।

6

চিত্রে প্লাস্টিক রিজিওন নামে যে অঞ্চল দুটি দেখানো হয়েছে তার ব্যাখ্যা এই যে উক্ত তাপমাত্রা অঞ্চলে পৌছলে সোল্ডার পুরোপুরি গলে যাবে না বরং অর্ধতরল অবস্থায় থাকবে। আপনারা যখন সোল্ডার কিনবেন তখন আপনার কাজের ধরন অনুযায়ী সোল্ডার নির্বাচন করুন। সুক্ষ ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতী যেমন আইসি, ট্রানজিস্টর যেগুলি উচ্চ তাপমাত্রায় নষ্ট হতে পারে সেগুলি সোল্ডারিং করার জন্য নিম্ন গলনাংক বিশিষ্ট সোল্ডার নির্বাচন করুন। আর ভারি সোল্ডারিং যেমন মোটা কপারের তার মোটা কম্পোনেন্টের টার্মিনালের ক্ষেত্রে উচ্চ গলনাংক বিশিষ্ট সোল্ডার নির্বাচন করুন। বাজারে যে অনুপাতের সোল্ডারটি সবচে বেশী পাওয়া যায় তা হলো ৬০/৪০ অনুপাত এবং এর গলনাংক ৩৭০ ডিগ্রি ফাঃ।

বাজারে প্রাপ্য সোল্ডারসমূহ বিভিন্ন ব্যাসের হয়ে থাকে চিকন এবং মোটা। কয়েকটি আদর্শ ব্যাস হলো ০.২৫ মিঃমিঃ, ০.৩৮ মিঃমিঃ ০.৫ মিঃমিঃ, ০.৮১ মিঃমিঃ, ১ মিঃমিঃ, ১.৫৭ মিঃমিঃ এবং আরো অনেক। সুক্ষ কাজের জন্য চিকন সোল্ডার এবং ভারি কাজের জন্য মোটা সোল্ডার। বেছে নিন আপনার চাহিদানুযায়ী আপনার সোল্ডার।

সোল্ডার কিভাবে কাজ করে?

কিছু মানুষ ধারণা করে যে, সোল্ডারিং হল এক ধরনের ওয়েলডিং অথবা সোল্ডার এক ধরণের আঁঠা যা কাম্পোনেন্টসমূহকে জোড়া দিতে সাহায্য করে। কিন্তু তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল, সোল্ডারিং কখনোই ওয়েলডিং নয়। সোল্ডারিং ও ওয়েলডিং প্রকৃয়ার পার্থক্য পূর্বে বর্ণনা করেছি। সোল্ডার কোন আঁঠা নয়। অধিকাংশ আঁঠা বৈদ্যূতিক ভাবে অপরিবাহী তাই আঁঠা ব্যবহার করলে বৈদ্যূতিক সু-পরিবাহী সংযোগ সৃষ্টি হয় না। তাহলে প্রশ্ন হলো সোল্ডার কিভাবে কাজ করে?

আমরা খালি চোখে একটি ধাতব তলকে দেখলে অনেক মসৃণ মনে হয়। কিন্তু মাইক্রোসকোপে দেখলে তা অনেক সুক্ষ ছিদ্র যুক্ত, অমসৃণ ও খসখসে দেখায়। সুতরাং আপাত দৃষ্টিতে কোন ধাতব সারফেসকে মসৃণ মনে হলেও প্রকৃত পক্ষে তা বহু সুক্ষ ছিদ্র বিশিষ্ট। যখন সোল্ডার গলিত ও তরল অবস্থায় কপার তলের উপর প্রবাহিত হয় তখন গলিত সোল্ডার কপার তলের সুক্ষ ছিদ্রসমূহের মধ্যে প্রবেশ করে এবং ঠান্ডা জমাটবদ্ধ হলে শক্ত সংযোগ সৃষ্টি করে।

৩। সোল্ডারিং ফ্লাক্সঃ

এই বিষয়টি বুঝার আগে একটি বিষয় বুঝে নেয়া দরকার তা হলো জারণ ক্রিয়া বা অক্সিডেশন (Oxidation)। যখন একটি ধাতব তল উন্মুক্ত বাতাসের মধ্যে সোল্ডারিং আয়রনের তাপে উত্তপ্ত হয় তখন দ্রুত বাতাসের অক্সিজেন ধাতুর সাথে যুক্ত হয়ে ধাতব অক্সাইড উৎপন্ন করে এবং ধাতুর উপরিতলে অক্সাইডের স্তর সৃষ্টি হয়। এই অক্সাইড স্তরটি বৈদ্যূতিকভাবে অপরিবাহী এবং ধাতব তলে গলিত সোল্ডার প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে গলিত সোল্ডার পানির ফোটার ন্যায় জমে থাকে ছড়ায় না। এটি একটি সমস্যা। আবার দীর্ঘক্ষণ সোল্ডারকে উত্তপ্ত রাখলে সোল্ডার নিজেও অক্সাইড উৎপন্ন করে ফলে তা খসখসে ও অমসৃণ হয়ে থাকে তখন ওয়ার্কপিচ অক্সাইড বিহীন থাকলেও তাতে ছড়ায় না। ফলে সংযোগ সৃষ্টি হয় না। এই সমস্যা দুর করার জন্য এক ধরণের রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা হয় যা সোল্ডারিং করার সময় উত্তপ্ত সোল্ডার ও ওয়ার্কপিচের উপর দিলে সোল্ডার ও ওয়ার্কপিচ হতে অক্সাইড দুর করে ধাতব তলের সুক্ষ ছিদ্র পথে সোল্ডারকে প্রবাহিত করে শক্ত সংযোগ সৃষ্টি করতে সাহায্য করে। এই রাসায়ণিক দ্রব্যসমূহকে সোল্ডারিং ফ্লাক্স বলা হয়।

সোল্ডারিং কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরণের ফ্লাক্স হলো গাম রজন যা বার্নিশ বা হ্যার্ডওয়্যারের দোকানে পাওয়া যায় এবং যা রজন মামেই পরিচিত, সোল্ডারিং পেষ্ট, তরল রজন ফ্লাক্স ইত্যাদি।

7FLX

অতীতের দিনগুলিতে টেকনোলজি যখন উন্নত ছিলনা তখন ফ্লাক্স বিহীন সোল্ডার ব্যবহার হতো। কিন্তু আধুনিক সোল্ডারগুলিতে সোল্ডার ওয়্যারের দৈর্ঘ্য বরাবর অভ্যন্তরভাগে ফ্লাক্স দেয়া থাকে অর্থাত রজন বা পেস্ট দেয়া থাকে যা উপরোক্ত চিত্রে দেখানো হয়েছে। তাই সোল্ডারিং করার সময় অতিরিক্ত রজন বা পেষ্ট ব্যবহারের প্রয়োজন পড়েনা। কিন্তু সোল্ডারে ফ্লাক্স না থাকলে কিংবা একবার ব্যবহৃত সোল্ডার দ্বারা পূনরায় সোল্ডারিং করতে চাইলে অতিরিক্ত ফ্লাক্স বা রজন ব্যবহার করতে হবে।

8

নিচের চিত্রে রজন দেখানো হলো। রজন মূলতঃ কী? ইহা মূলতঃ একটি প্রাকৃতিক জৈব যৌগ, এর প্রধাণ উপাদান হলো এবিয়েটিক এসিড যার রাসায়নিক সংকেত (C19H29COOH)প্রকৃতিতে পাইন গাছের (Pine Tree) ক্ষতস্থান হতে এক প্রকার রস নির্গত হয় যাতে এবিয়েটিক এসিড বিদ্যমান থাকে। এই রস সংগ্রহ করে কারখানায় পাতন প্রকৃয়ায় ময়লা ও অপ্রয়োজনীয় অংশ দুর করে এই রজন প্রস্তুত করা হয়।

9

এছাড়া আরও এক ধরণের ফ্লাক্স রয়েছে তা হলো তরল এসিড ফ্লাক্স। ইলেকট্রনিক প্রযুক্তিতে এটি ব্যবহার হয় না কারণ এসিড দ্বারা ইলেকট্রনিক কম্পোনেন্টের ক্ষতি হয় এবং এসিড বিদ্যূত পরিবাহী হওয়ার কারনে শর্ট সার্কিট সৃষ্টির সম্ভবনা রয়েছে।

ওয়ার্কপিচঃ

ইলেকট্রনিক সোল্ডারিং এর ক্ষেত্রে ওয়ার্কপিচ হলো সার্কিট কম্পোনেন্টের টার্মিনাল এবং পিসিবির কপার ট্রেস।

পিসিবিঃ

PCB – Printed Circuit Board. প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড একটি বিশেষ ধরণের এবোনাইট নির্মিত বোর্ড যার এক পার্শ্ব তলে কম্পোনেন্টের গ্রফিক্যাল সিম্বল থাকে, এই পার্শ্বকে বলা হয় কম্পোনেন্ট সাইড এবং অপর পার্শ্বতলে তামা/কপারের সুক্ষ ট্রেস বোর্ডের সাথে লাগানো থাকে, এই পার্শ্বকে বলা হয় সোল্ডারিং সাইড। পিসিবির সুক্ষ কপার ট্রেসগুলি কম্পোনেন্টসমূহের মধ্যে বৈদ্যূতিক সংযোগ রক্ষা করে অর্থাত পরিবাহী তারের ন্যয় কাজ করে। কম্পোনেন্টসমূহ লাগানোর জন্য বোর্ডে অনেক ছিদ্র করা থাকে। কম্পোনেন্টের পা/পিনসমূহ কম্পোনেন্ট সাইডের ছিদ্র পথে প্রবেশ করিয়ে সোল্ডারিং সাইডের কপার ট্রেসের সাথে সোল্ডারিং করে আটকানো হয়।

10

অনেক সময় সার্কিটের আকার ছোট করার জন্য অর্থাত অনেক বড় সার্কিটকে কম যায়গায় সংকুচিত করার জন্য পিসিবির উভয় সাইডেই কপার ট্রেস স্থাপন করে সোল্ডারিং করা হয়। এই পদ্ধতিতে খরচ কমে আসে। কম্পিউটারের মাদার বোর্ড এধরণের পিসিবির উদাহরণ।

কম্পোনেন্টঃ

রেজিস্টর, ক্যাপাসিটর, ইন্ডাকটর, ডায়োড, আইসি ইত্যাদি ইলেকট্রনিক কম্পোনেন্ট সোল্ডারিং কাজের ওয়ার্কপিচ বলা হয়।

11

কিছু হ্যান্ডটুলসঃ

সোল্ডারিং করার সময় কিছু হ্যান্ড টুল হাতের কাছে রাখতে হয় যেমন – শিরিষ কাগজ অথবা ব্লেড, কাটিং প্লায়ার, টুইজার, থিনার ইত্যাদি।

সঠিক সোল্ডারিং করার কৌশলঃ

১। সোল্ডারিং করার পূর্বে পিসিবির কপার ট্রেসসমূহ যেখানে সোল্ডারিং করা হবে সেই স্থানগুলি ভালভাবে শিরিষ কাগজ অথবা ব্লেড দিয়ে ঘষে পরিস্কার করে নিতে হবে কারণ কপারের উপরে কপার অক্সাইডের আবরণ সৃষ্টি হয় এই আবরণের উপরে সোল্ডারিং লাগবে না।

২। সকল কম্পোনেন্টসমূহের পিন ও টার্মিনালসমূহ একই ভাবে শিরিষ কাগজ অথবা ব্লেড দিয়ে ঘষে পরিস্কার করতে হবে।

৩। পিসিবিতে ছোট ছোট কম্পোনেন্ট যেমন রেজিস্টর, ডায়োড ইত্যাদি আগে লাগাতে হবে এবং অপেক্ষাকৃত বড় কম্পোনেন্টসমূহ পরে লাগাতে হবে।

৪। সোল্ডারিং আয়রনকে পিসিবির কপার ট্রেসের সাথে বেশী সময় ধরে রাখা উচিত নয় কারন এতে কপার ট্রেসে অতিরিক্ত তাপ প্রয়োগের কারনে কপারের স্তর বোর্ড হতে আলগা হয়ে উঠে আসতে পারে। অতিরিক্ত তাপ প্রয়োগে বিভিন্ন স্পর্শকাতর ইলেকট্রনিক ডিভাইস যেমন আইসি নষ্ট হয়ে যেতে পারে, তাই যতটা সম্ভব কম সময় সংযোগ বিন্দুতে তাপ প্রয়োগ করতে হবে।

৫। সূক্ষ সোল্ডারিং যেমন আইসির পিন সোল্ডারিং করার জন্য চিকন অর্থাত ০.৫ মিঃ মিঃ ব্যাসের সোল্ডার ও সূচালো সোল্ডারিং আয়রন ব্যবহার করুন। মোটা কম্পোনেন্ট ও ভারি সোল্ডারিং করার জন্য মোটা ১ মিঃমিঃ হতে ১.২৫ মিঃ মিঃ ব্যাসের সোল্ডার এবং ফ্লাট বা চ্যাপ্টা ও বড় ৬০ থেকে ৮০ ওয়াটের সোল্ডারিং আয়রন ব্যবহার করুন।

৬। যখন সোল্ডারিং করবেন তখন সোল্ডারিং আয়রনকে এমনভাবে স্থাপন করুন যেন আয়রনের টিপটি কপার ট্রেস ও কম্পোনেন্টের পিন উভয়কেই স্পর্শ করে এবার সোল্ডারকে আয়রনের টিপের উপর কম্পোনেন্ট পিনের নিকটবর্তী স্থানে স্থাপন করুন অথবা টিপ যে পার্শ্বে স্থাপিত হয়েছে তার বিপরীত পার্শ্বে স্থাপন করুন। এতে সোল্ডার আয়রন টিপের তাপে গলে টিপ চুইয়ে কপার ট্রেসের উপর ও কম্পোনেন্ট পিনের চারপার্শ্বে ছড়িয়ে পড়বে। এরূপ অবস্থা বুঝা গেলে সাথে সাথে টিপটি উঠিয়ে নিতে হবে। ফলে সোল্ডার তাপ বিকিরণ করে ঠান্ডা হয়ে জমে শক্ত সংযাগ সৃষ্টি করবে।

12

উপরের চিত্রটিতে একটি সুন্দর সোল্ডারিং এর চিত্র দেয়া হয়েছে। কিভাবে বুঝবেন সোল্ডারিং সুন্দর হয়েছে? যখন সোল্ডারিং দেখতে উপরোক্ত চিত্রের ন্যয় পর্বতের মত হয় এবং সোল্ডার খুব মসৃণ ও আটসাট ভাবে ওয়ার্কপিচের সাথে লেগে থাকে তখন বুঝা যাবে সোল্ডারিং ভাল হয়েছে।

13

৭। সোল্ডারিং আয়রনের টিপকে কম্পোনেন্ট টার্মনালের সবচেয়ে নিকটবর্তী স্থানে স্থাপন করতে। দুরত্বে স্থাপন করা ভুল পদ্ধতি কারন এতে জাংশন পয়েন্টে কম তাপ সরবরাহ হয় ফলে সোল্ডার ভাল ভাবে গলেনা ও সংযোগ দৃঢ় হয় না বরং খসখসে, শুষ্ক ও ঠান্ডা সংযোগ সৃষ্টি হয়। উপরের চিত্রে কোনিক্যাল টিপ ও চ্যাপ্টা টিপ স্থাপনের নিয়ম দেখানো হয়েছে। কোনিক্যাল টিপের পার্শ্বকে কম্পোনেন্ট টার্মিনালের সাথে লাগিয়ে স্থাপন করতে হয় টিপের সূঁচালো প্রান্ত কপার ট্রেসে স্থাপন করা ভুল পদ্ধতি এতে যথাযথ পরিমান তাপ ওয়ার্কপিচে সরবরাহ হয় না। চ্যাপ্টা টিপকে চিত্রের মত করে কম্পোনেন্ট টার্মিনালের সাথে লাগিয়ে স্থাপন করতে হয়।

৮। এতক্ষণ আমরা জানলাম কোথায় টিপ স্থাপন করতে হয় এবার জানি কোথায় সোল্ডার প্রয়োগ করতে হয়। সংযোগ পয়েন্টে টিপ স্থাপন করে ২ থেকে ৩ সেকেন্ড ধরে রাখলে ওয়ার্কপিচ উত্তপ্ত হয়ে উঠবে এর পর সোল্ডার প্রয়োগ করতে হয়। দুইভাবে সোল্ডার প্রয়োগ করা যায়। (১) সোল্ডারকে আয়রনের টিপের উপর কম্পোনেন্ট পিনের নিকটবর্তী স্থানে স্থাপন করুন। (২) অথবা টিপ যে পার্শ্বে স্থাপিত হয়েছে তার বিপরীত পার্শ্বে স্থাপন করুন চিত্রের মত।

14

৯। নিচের চিত্রে কিছু ভাল সোল্ডারিং দেখানো হয়েছে। ভাল সোল্ডারিং বুঝবেন কিভাবে? ভাল সোল্ডারিংগুলি দেখতে খুব মসৃণ পর্বতাকৃতি হবে খুব বেশী সোল্ডার জমা হবেনা, আটসাট ভাবে ওয়ার্কপিচের সাথে দৃঢ়ভাবে লেগে থাকবে এবং কম্পোনেন্ট টার্মিনালের চারপাশ সোল্ডারে আবৃত থাকবে। নিচের চিত্রের মত।

15

১০। এতক্ষণ আমরা জানলাম কোথায় সোল্ডার স্থাপন করতে হয় এবার জানি কি পরিমান সোল্ডার প্রয়োগ করতে হয়। এমন ভাবে সোল্ডার প্রয়োগ করতে হবে যেন সোল্ডারের পরিমান বেশী না হয় এবং কম না হয়। নিচের চিত্রে সঠিক পরিমান সোল্ডার দেখানো হয়েছে। নূন্যতম যে পরিমান সোল্ডার প্রয়োগ করলে কম্পোনেন্ট টার্মিনালের চারপার্শ্ব আবৃত হয় সে পরিমান সোল্ডার প্রয়োগ করতে হবে এবং তা দেখতে পর্বতাকৃতি হবে। সোল্ডার যদি গোলাকৃতি হয় তবে বুঝতে হবে সোল্ডার বেশী হয়েছে। বেশী সোল্ডার দেয়ার কুফল হলো সোল্ডারের অপচয় এবং অনেক সময়ই বেশী সোল্ডার পার্শ্বস্থ ট্রেসের সাথে শর্ট সার্কিট সৃষ্টি করে।

16

১১। এবার আমরা খারাপ জাংশন চেনার উপায়, খারাপ জাংশন সৃষ্টির কারণ এবং খারাপ জাংশনকে ভাল জাংশনে রূপান্তরের প্রকৃয়া জানব। নিচের চিত্রে কয়েকটি খারাপ জাংশন দেখানো হয়েছে। খারাপ জাংশনকে কোল্ড জাংশন বা ড্রাই জাংশন বলে কারণ এগুলি সোল্ডারিং আয়রনের অপর্যাপ্ত তাপমাত্রার করনে সৃষ্টি হয় এবং ওয়ার্কপিচ সঠিকভাবে সোল্ডারে ভিজেনা। খারাপ সোল্ডারিং দেখতে খসখসে অসম গোলাকৃতি হয় কিংবা কখনো ওয়ার্কপিচের সাথে সঠিকভাবে লেগে থাকেনা নিচের চিত্রের মত। খারাপ সোল্ডারিং সৃষ্টির কারণ হলো সোল্ডারিং আয়রণের অপর্যাপ্ত তাপমাত্রা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, সোল্ডারিং কাজে অনভিজ্ঞতা ইত্যাদি। ভাল সোল্ডারিং করার জন্য আয়রনের তাপমাত্রা সোল্ডারের মেলটিং পয়েন্ট/গলনাংক অপেক্ষ বেশী হতে হবে। ধরুন আপনি ৬০/৪০ সোল্ডার ব্যবহার করছেন এর গলনাংক ৩৭০ ডিগ্রি ফাঃ/১৮৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। তাহলে আয়রনের তাপমাত্রা ১৮৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড অপেক্ষা বেশী হতে হবে, উদাহরণ সরূপ তাপমাত্রা ৪৬০ ডিগ্রি ফাঃ/২৩৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড হতে পারে। এভাবে আপনার ব্যবহৃত সোল্ডারের ধরণ বুঝে আপনার আয়রনের তাপমাত্রা নির্ধারন করুন। বেশী ওয়াটের আয়রন ব্যবহার করলে বেশী তাপমাত্রা পাওয়া যায়। তাপমাত্রা কম হলে সোল্ডারিং ভাল হয়না আবার বেশী তাপমাত্রারও কুফল রয়েছে। তাপমাত্র খুব বেশী হলে সোল্ডারের অভ্যন্তরীন ফ্লাক্স দ্রুত বাষ্পে পরিনত হয় বা উদায়ী হয় ফলে এক্ষেত্রেও সোল্ডারর অক্সাইড উৎপন্ন হয়ে শুষ্ক ও খসখসে সোল্ডারিং সৃষ্টি হয়, তাই আপনার সোল্ডারের ধরন বুঝে সঠিক তাপমাত্রা নির্ধারন করুন। পরিমিত মাত্রায় সোল্ডার প্রয়োগ করুন, খুব বেশী নয় কমও নয়।

17

এবার আসুন খারাপ সোল্ডারিংকে ( শুষ্ক, ঠান্ডা জাংশন) উন্নত করার চেষ্টা করি। উপরের চিত্রে কিছু খারাপ জাংশন দেখানো হয়েছে। এরূপ জাংশনকে উন্নত করতে হলে পরিমিত মাত্রায় উত্তপ্ত আয়রন টিপকে জাংশনের উপর স্থাপন করে সোল্ডারকে গলাতে হবে এবং অতঃপর গলিত সোল্ডরের উপর রজন গুড়া ছিটিয়ে দিলে উৎপন্ন অক্সাইড দুর হয়ে জাংশনটি ধীরে ধীরে মসৃণ ও সুন্দর হবে।

সারফেস মাউন্ট সোল্ডারিং

সোল্ডারিং এর প্রকারভেদ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব না, তাতে আলাচনার আকার বৃদ্ধি পাবে। তবে ইলেকট্রনিক প্রযুক্তিতে বর্তমানে একটি বিশেষ ধরনের সোল্ডারিং প্রযুক্তি বেশ কার্যকর ও জনপ্রিয় তা হলো সারফেস মাউন্ট সোল্ডারিং। কম্পিউটার ও বিভিন্ন ভারি ইলেকট্রনিক সিস্টেমের মাদারবোর্ড যেখানে বিপুল পরিমান সুক্ষ কম্পোনেন্ট সংযোগ করা হয় এবং যা হাতে সোল্ডারিং করা সম্ভব নয় সেগুলি আধুনিক মেশিন দ্বারা মাদারবোর্ডে কপার ট্রেসের সারফেসের সাথে সোল্ডারিং করা হয়। এগুলি হল সারফেস মাউন্ট সোল্ডারিং।

18

ডিসোল্ডারিং

ভুল কম্পোনেন্ট সোল্ডারিং করলে অথবা কোন কারনে সোল্ডারিং করা কম্পোনেন্ট খুলে ফেলার প্রয়োজন হলে উক্ত সোল্ডারিংকৃত কম্পোনেন্টটি খুলে ফেলার প্রকৃয়াকে ডিসোল্ডারিং বলে। এর জন্য একটি বিশেষ ধরণের যন্ত্র ব্যবহার করা হয় যাকে ডিসোল্ডারিং পাম্প বলা হয়, অনেকে এক সাকার বলে থাকেন।

19

ডিসোল্ডারিং করার জন্য উত্তপ্ত সোল্ডারিং আয়রনকে জাংশন পয়েন্টে ধরে সোল্ডারকে গলাতে হবে এর পর গলিত সোল্ডারের উপর সাকারের নলটি স্থাপন করে ট্রিপ করলেই গলিত সোল্ডার জাংশন পয়েন্ট হতে উঠে আসবে এবং জাংশনটি মুক্ত হবে।

সোল্ডারিং কাজে সাবধানতাঃ

১। সোল্ডারিং করার সময় উত্তপ্ত আয়রনকে সর্বদা স্ট্যান্ডের/ধারকের উপর রাখতে হবে। কাঁঠ, আসবাব, কাপড় ইত্যাদির উপর ভুলেও রাখা যাবেনা।

২। উত্তপ্ত আয়রন নিয়ে যেখানে সেখানে (বিছানা, মাদুর ইত্যাদির উপর) কাজ করা উচিত নয়, সর্বদা নির্ধারিত ওয়ার্কিং টেবিলে কাজ করতে হবে।

৩। কাজ শেষে আয়রনকে ঠান্ডা করে শিশুদের নাগালের বাহিরে লুকিয়ে রাখতে হবে।

৪। অনেক সময় সোল্ডারিং আয়রনের কয়েল ও ইনসুলেটিং সিস্টেম নষ্ট হয়ে গেল তা আয়রনের বডির সাথে শর্ট হয়ে থাকে, এরূপ ত্রুটিপূর্ণ আয়রন ব্যবহার করলে মারাত্নক বৈদ্যূতিক শক লাগার সম্ভবনা রয়েছে তাই এরূপ ত্রটিপূর্ণ আয়রন পরিত্যাগ করতে হবে।

৫। সোল্ডারিং করার সময় কম্পোনেন্টকে হাতে ধরার প্রয়োজন হলে অবশ্যই টুইজার ব্যবহার করতে হবে। নতুবা হাতে তাপ লেপে হাত পুড়ে যেতে পারে।

৬। সোল্ডারিং শেষে আয়রনের টিপটি ভালভাবে নাইফ দ্বারা ঘষে পরিস্কার করে শিশুদের নাগালের বাইরে লুকিয়ে রাখুন।

৭। সোল্ডারি কাজের শেষে অবশ্যই সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন।

20

অবশেষে বলব আপনারা সঠিকভাবে সোল্ডারিং করুন। আর কোন প্রশ্ন থাকলে মন্তব্য করুন। ধন্যবাদ।

—–

Share this post

Post Comment