বুলিয়ান বীজগণিতের প্রাথমিক কথা

ভূমিকাঃ

আজ অনেক দিন পর লিখতে ইচ্ছে হলো। কোন টপিক নিয়ে লিখব? অবশেষে বুলিয়ান বীজগণিত বিষয়টি চয়ন করলাম এ কারনে যে, বিষয়টি ইলেকট্রক্সের শিক্ষার্থীদের নিকট খুবই গুরুত্ত্বপূর্ণ। একটি ডিজিটাল সিস্টেমের লজিক্যাল বর্তনীসমূহ বিভিন্ন জটিল লজিক্যাল ফাংশন অনুযায়ী ডেভেলপ করা হয় যা বিশেষ এক ধরনের বীজগাণিতিক পদ্ধতির মাধ্যমে সহজে সমাধান ও সরল করা যায়। এই পদ্ধতির নাম ‘বুলিয়ান বীজগণিত’ একে কখনো কখনো ‘Switching Algebra’ও বলা হয়ে থাকে।

বুলিয়ান বীজগণিতের পরিচয়ঃ

গণিতশাস্ত্র এবং গাণিতিক যুক্তি বিদ্যায় ‘বুলিয়ান বীজগণিত’কে বীজগণিতের একটি শাখা হিসাবে গন্য করা হয়। বুলিয়ান বীজগণিতে ব্যবহৃত ভেরিয়েবলসমূহের দুটি স্তর বা মান থাকে একটি সত্য বা True’ এবং অপরটি মিথ্যা বা False’। লিখার সুবিধার্থে সত্যকে ‘1’ দ্বারা এবং ‘মিথ্যাকে ‘0’ দ্বারা প্রকাশ করা হয়। বুলিয়ান বীজগণিতের এই দ্বিস্তরীয় বৈশিষ্ট্যের কারনে পরবর্তী যুগে যখন কম্পিউটার এবং বিভিন্ন ডিজিটাল ইলেকট্রনিক সার্কিটে বাইনারী সংখ্যা পদ্ধতির ব্যবহার শুরু হয় তখন বিভিন্ন জটিল যৌক্তিক অপারেশনসমূহের সমাধান এবং সরলীকরণের ক্ষেত্রে বুলিয়ান বীজগণিত ব্যবহার করা হতো। তখন থেকেই গণিত শাস্ত্রের এ শাখাটি ব্যাবহারিকভাবে প্রকৌশল বিদ্যার সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে ব্যবহার হতে থাকে এবং বর্তমানে কম্পিউটার ও ডিজিটাল ইলেকট্রনিক্সের উন্নয়নে ব্যপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ব্যবহারিক বা প্রয়োগিক ক্ষেত্রে বুলিয়ান বীজগণিত একটি বিশেষ ধরনের বীজগাণিতীয় পদ্ধতি যা দুটি লজিক অবস্থা ‘1’ এবং ‘0’ নিয়ে কাজ করে। ডিজিটাল সার্কিটসমূহ বহু সংখ্যক সুইচ নিয়ে গঠিত যার ‘ON’ অবস্থাকে লজিক ‘1’ এবং ‘OFF’ অবস্থাকে লজিক ‘0’ দ্বারা উপস্থাপন করা হয়, এবং যা বুলিয়ান বীজগণিতের দুটি স্তর ‘সত্য বা True’ এবং ‘মিথ্যা বা False এর সাথে খুবই সাদৃশ্যপূর্ণ। একারনেই ডিজিটাল সার্কিটসমূহের লজিক মেনিপুলেশনের (Manipulation) জন্য বুলিয়ান বীজগণিত একটি আদর্শ পদ্ধতি। Logical Veriable এবং Logical Operation সমন্বয়ে গঠিত বীজগণিতই বুলিয়ান বীজগণিত।

উৎপত্তিঃ

Photo of Boole
জর্জ বুলি

১৮৪৭ সালে ইংলিশ গণিতবিদ জর্জ বুলি (George Boole) তার বই The Mathematical Analysis of Logic’ এ লজিক সমীকরণ বিশ্লেষণের মূল ও আদি সূত্রসমূহ গাণিতিক পরিভাষায় উস্থাপন করেন যা বর্তমানে আধুনিক ডিজিটাল ইকুইপমেন্ট ডিজাইন এবং অধিকাংশ প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজে কোর ডাটা টাইপ হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যুক্তি বিশ্লেষণের প্রয়োজনে ১৮৫৪ সালে জর্জ বুলি তার অপর গ্রন্থ An Investigation of the Laws of Thought এ একটি বিশেষ ধরণের বীজগাণিতিক পদ্ধতি উপস্থাপন করেন যার সাহায্যে লজিক ‘Logic’ এর ‘Systematic Treatment’ বিষয়ে ধারণা দেয়া হয় এবং এটি বর্তমানে বুলিয়ান বীজগণিত নামে পরিচিত। কিন্তু তার এই আবিষ্কার ১৯৩৮ সালের পূর্ব পর্যন্ত বিশেষ কোন ব্যবহারিক কাজে আসেনি। পরবর্তী সময়ে গত বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ইংলিশ গবেষক William Stanley Jevons’, জার্মান গণিতবিদ Friedrich Wilhelm Karl Ernst Schröder’, এবং আমেরিকান গণিতবিদ Edward Vermilye Huntington’ প্রমুখ গবেষকগণের গবেষণা দ্বারা বুলিয়ান বীজগণিত আরো কিছুটা গঠিত তত্ত্বভিত্তিক গাণিতিক কাঠামো লাভ করে। পরবর্তীতে ১৯০৪ সালেE. V. Huntington’ কিছু স্বতঃসিদ্ধ উদ্ভাবন করেন যা বুলিয়ান বীজগণিতকে আরো গঠিত রূপে সংগায়িত করতে সাহায্য করে। ১৯৩০ সালে আমেরিকান গণিতবিদ Claude Elwood Shannon’ সুইচিং সার্কিট নিয়ে কাজ করার সময় প্রত্যক্ষ করেন যে, বুলিয়ান বীজগণিতের স্বতঃসিদ্ধসমূহ ব্যবহারিকভাবে সুইচিং সার্কিট বাস্তবায়নের কাজে লাগানো যায় এবং তিনি টেলিফোনের সুইচিং বর্তনীতে সর্বপ্রথম বুলিয়ান বীজগণিতের বাস্তব প্রয়োগ ঘটান। ১৯৩৮ সালে স্যার শ্যানন Two-Valued Boolean Algebra’ পদ্ধতির উন্নয়ন করেন এবং ব্যাখ্যা করেন যে, বাইস্ট্যাবল ইলেকট্রিক সুইচিং সার্কিটের বৈশিষ্ট্যসমূহ এই বীজগাণিতীয় পদ্ধতির মাধ্যমে উপস্থাপন করা সম্ভব। বর্তমানে বুলিয়ান বীজগণিত ডিজিটাল সিস্টেম ডিজাইনে ব্যপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে।

বুলিয়ান বীজগণিতের অন্তর্গত বিষয়াদিঃ

১। লজিক্যাল ভেরিয়েবল
২। কনস্ট্যান্ট বা ধ্রুবক
৩। অপারেটর
৪। স্বতঃসিদ্ধ ও উপপাদ্যসমূহঃ

১। লজিক্যাল ভেরিয়েবলঃ সাধারণ বীজগণিতের মতই বুলিয়ান বীজগণিতে ভেরিয়েবলের ব্যবহার রয়েছে যাদের বিভিন্ন ইংরেজী বর্ণ A, B, C, D ইত্যাদি দ্বারা প্রকাশ করা হয় তবে বুলিয়ান ভেরিয়েবলসমূহের লজিক্যাল মান ‘সত্য’ এবং ‘মিথ্যা’ অর্থাৎ ‘1’ এবং ‘0’ এ দুটির মধ্যেই পরিবর্তনশীল।

২। কনস্ট্যান্ট বা ধ্রুবকঃ বুলিয়ান বীজগণিতে ‘1’ এবং ‘0’ এ দুটি লজিক্যাল ধ্রুবকের ব্যবহার রয়েছে। ধ্রুবকের মান সর্বদা স্থির থাকে। মনে রাখতে হবে যে, দেখতে একই রকম মনে হলেও বুলিয়ান বীজগণিতে ব্যবহৃত ‘1’ ও ‘0’ এবং বাইনারী অংক ‘1’ ও ‘0’ একই বিষয় নয়। বাইনারী সংখ্যাপদ্ধতির ‘1’ এবং ‘0’ হলো দুটি অংক কিন্তু বুলিয়ান বীজগণিতের ‘1’ হলো ‘লজিক সত্য’ এবং ‘0’ হলো ‘লজিক মিথ্যার’ সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনা।

৩। অপারেটরঃ ভেরিয়েবল এবং কনস্ট্যান্টের উপর বিভিন্ন লজিক্যাল অপারেশন চালানোর জন্য ব্যবহৃত প্রতীক বা চিহ্নকে অপারেটর বলা হয়। বুলিয়ান বীজগণিতে ব্যবহৃত মৌলিক অপারেটর তিনটি যেমনঃ AND যাকে (.) চিহ্ন দ্বারা, OR যাকে (+) চিহ্ন দ্বারা এবং NOT যাকে ´ অথবা ¯ চিহ্ন দ্বারা প্রকাশ করা হয়।

৪। স্বতঃসিদ্ধসমূহঃ (Postulates): বুলিয়ান বীজগণিতে শুধুমাত্র বুলিয়ান যোগ এবং বুলিয়ান গুণের সাহায্যে সকল হিসাব করা হয়। যোগ এবং গুণের ক্ষেত্রে এই বীজগণিত কিছু বিশেষ নিয়ম মেনে চলে। এই নিয়মসমূহকে স্বীকার্য বা স্বতঃসিদ্ধ বা ‘Postulates’ বলা হয়।

বুলিয়ান যোগের ক্ষেত্রে স্বতঃসিদ্ধসমূহ নিম্নরূপঃ

0 + 0 = 0 ………………. (i)
0 + 1 = 1 ……………… (ii)
1 + 0 = 1 ……………… (iii)
1 + 1 = 1 ……………… (iv)

সমীকরণ (i) হতে সমীকরণ (iii) পর্যন্ত যোগগুলি আমাদের পরিচিত বীজগণিতের নিয়মের সাথে মিল আছে কিন্তু সমীকরণ (iv) এর সাথে আমাদের পরিচিত বীজগণিতের কোন মিল নেই। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে বুলিয়ান বীজগণিতের ‘+’ চিহ্ন সাধারণ যোগকে বুঝায় না। বুলিয়ান যোগকে লজিক্যাল OR অপারেশন বলা হয়।

বুলিয়ান গুণের ক্ষেত্রে বুলিয়ান বীজগণিতের স্বতঃসিদ্ধসমূহ নিম্নরূপঃ

0 . 0 = 0
0 . 1 = 0
1 . 0 = 0
1 . 1 = 1

বুলিয়ান গুণকে লজিক্যাল AND অপারেশন বলা হয়।

বুলিয়ান পূরক (Complement):

বুলিয়ান বীজগণিতের ভাষায় ‘0’ এবং ‘1’ কে একটি অপরটির পূরক বলা হয়। পূরককে প্রকাশ করা হয় NOT অপারেটরের চিহ্ন ´ অথবা ¯ দ্বারা। উদাহরণসরূপঃ ‘0’ এর পূরক ‘1’ এবং ‘1’ এর পূরক ‘0’। উক্ত বিষয়টি বুলিয়ান ভেরিয়েবলের জন্য লেখা হয় ‘A’ এর পূরক ‘A̅’ আবার ‘A̅’ এর পূরক ‘A’। কখনো কখনো ‘A̅’ কে A´ দ্বারাও প্রকাশ করা হয়। যদি A = 0 হয় তবে A̅ = 1 আবার A = 1 হলে A̅ = 1 হবে।

হান্টিংটনের (Huntington’s) স্বতঃসিদ্ধসমূহঃ

১৯০৪ সালেE. V. Huntington’ কিছু স্বতঃসিদ্ধ ব্যাখ্যা করেন যা বুলিয়ান বীজগণিতকে সুগঠিত রূপে সংগায়িত করতে সাহায্য করে তবে শুধু হান্টিংটনের স্বতঃসিদ্ধসমূহ দ্বারা পরিপূর্ণভাবে বুলিয়ান বীজগণিতকে সংগায়িত করা যায় না আরো কিছু স্বতঃসিদ্ধ প্রয়োজন হয়। বুলিয়ান বীজগণিত হান্টিংটনের স্বতঃসিদ্ধান্তসমূহ মেনে চলে যা নিম্নে উল্লেখিত হয়েছে –

১। (ক) + অপারেটরের সাপেক্ষে Closure (খ) . অপারেটরের সাপেক্ষে Closure

২। (ক) + অপারেটরের সাপেক্ষে 0 দ্বারা একটি Identity Element যেমনঃ X+0 = 0+X = X (খ) . অপারেটরের সাপেক্ষে 1 দ্বারা একটি Identity Element যেমনঃ X.1 = 1.X = X

৩। বিনিময় সূত্রঃ (ক) + অপারেটরের সাপেক্ষে বিনিময় যেমনঃ X+Y = Y+X (খ) . অপারেটরের সাপেক্ষে বিনিময় যেমনঃ X.Y = Y.X

৪। বিতরণ সূত্রঃ (ক) + অপারেটরকে . এর উপর বিতরণ, যেমনঃ X+(Y.Z)=(X+Y).(X+Z) (খ) . অপারেটরকে + এর উপর বিতরণ, যেমনঃ X.(Y+Z)=(X.Y)+(X.Z)

৫। সেট B এর প্রতিটি উপাদানের কমপ্লিমেন্ট উক্ত সেটের একটি উপাদান হবে, অর্থাত X∈B হলে X′∈B হবে। এক্ষেত্রেঃ (ক) X+X′=1 এবং (খ) X.X′=0 হবে।

৬। সেট B এর নূন্যতম দুটি আলাদা উপাদান থাকতে হবে যেখানে উপাদান দুটি পরস্পর অসমান হবে। যেমনঃ X,Y∈B যেখানে X≠Y। অর্থাত বুলিয়ান স্বতঃসিদ্ধসমূহ ব্স্তবায়নের জন্য নূন্যতম দুটি Logical Element প্রয়োজন।

** হান্টিংটনের স্বতঃসিদ্ধসমূহে অনুসংগ সূত্র বা (Associative Law) অন্তর্ভূক্ত ছিল না যদিও তা বুলিয়ান বীজগণিতে ব্যবহৃত হয়।

*** অনুসংগ সূত্রঃ (ক) X+(Y+Z)=(X+Y)+Z=Y+X+Z (খ) X.(Y.Z)=(X.Y).Z=Y.X.Z

*** উপরের স্বতঃসিদ্ধসমূহে X এবং Y বুলীয় চলক বা লজিক্যাল ভেরিয়েবল এবং B হলো বুলিয়ান বীজগণিতে ব্যবহৃত উপাদানসমূহের সেট।

বুলিয়ান বীজগণিত এবং সাধারণ বীজগণিতের মধ্যে তুলনাঃ

১। বিতরণ সূত্র + অপারেটরকে . এর উপর বিতরণ, যেমনঃ X+(Y.Z)=(X+Y).(X+Z) বুলিয়ান বীজগণিতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও সাধারণ বীজগণিতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
২। বুলিয়ান বীজগণিতে ডিভিশন এবং সাবট্রাকশন অপারেটরের ব্যবহার নেই যা সাধারণ বীজগণিতে রয়েছে।
৩। বুলিয়ান বীজগণিতে কমপ্লিমেন্ট বা NOT অপারেটরের ব্যবহার আছে যা সাধারণ বীজগণিতে নেই।
৪। সাধারণ বীজগণিত বাস্তব সংখ্যা নিয়ে কাজ করে যার সেটে অসীম সংখ্যক উপাদান থাকতে পারে। কিন্তু দ্বি-মানের (Two Valued) বুলিয়ান বীজগণিতের সেটে শুধুমাত্র দুটি উপাদান 1 এবং 0 থাকে।

দ্বি-মানের বুলিয়ান বীজগণিত (Two Valued Boolean Algebra):

দুই উপাদান বিশিষ্ট কোন সেটের (যেমনঃ B = {1, 0}) উপর বুলিয়ান বীজগণিতের স্বতঃসিদ্ধসমূহ প্রযুক্ত হলে তাকে দ্বি-মানের (Two Valued) বুলিয়ান বীজগণিত বলা হয়।

ইতোপূর্বেই আমরা জানি ডিজিটাল সার্কিটসমূহ দুটি লজিক নিয়ে কাজ করে একটি 0 এবং অপরটি 1 তাই ডিজিটাল ইলেকট্রনিক্সের উন্নয়ন এবং কার্যক্রমের সাথে বুলিয়ান বীজগণিতের যে রূপটি সংগতিপূর্ণ তা হলো দ্বি-মানের বুলিয়ান বীজগণিত বা ‘Two Valued’ বুলিয়ান বীজগণিত। যেহেতু আমাদের আলোচ্য মূল বিষয় ডিজিটাল ইলেকট্রনিক্স তাই এই প্রবন্ধটির পরবর্তী অংশ শুধুমাত্র দ্বি-মানের বুলিয়ান বীজগণিত নিয়ে আলোচনা করা হবে।

দ্বি-মানের বুলিয়ান বীজগণিতের ক্ষেত্রে স্বতঃসিদ্ধসমূহের প্রমাণঃ

দ্বি-মানের বুলিয়ান বীজগণিতের ক্ষেত্রে স্বতঃসিদ্ধসমূহের প্রমাণ সত্যক সারণী বা Truth টেবিল-১, ২, ৩ ও ৪ এর মাধ্যমে দেখানো হলোঃ
TVBA

১। উপরোক্ত টেবিল হতে দেখা যায় যে, প্রতিটি লজিক্যাল অপারেশনের ফলাফল 1 অথবা 0। যেখানে 1, 0∈B অর্থাত 1এবং 0 উভয়ে সেট B এর উপাদান সুতরাং দ্বি-মানের বুলিয়ান বীজগণিতের ক্ষেত্রে + ও . অপারেটরের সাপেক্ষে Closure প্রমাণিত।

২। উপরোক্ত টেবিল হতে দেখা যায় যে, (ক) 0+0=0, 0+1=1+0=1 এবং (খ) 1.1=1, 1.0=0.1=0 সুতরাং হান্টিংটনের ২ নং Postulate প্রমাণিত।

৩। বিনিময় সূত্র বাইনারী অপারেটর টেবিলের স্বাভাবিক নিয়মতান্ত্রিকতার মাধ্যমে প্রমাণিত।

৪। বিতরণ সূত্র X.(Y+Z)=(X.Y)+(X.Z) এবং X+(Y.Z)=(X+Y).(X+Z) প্রমাণের জন্য নিম্নের টেবিল-৪ প্রত্যক্ষ করি –

Table-4

উপরোক্ত টেবিলের মাধ্যমে দেখা যায় X, Y এবং Z এর সম্ভাব্য সকল মানের ক্ষেত্রে সর্বদা X.(Y+Z)=(X.Y)+(X.Z) এবং X+(Y.Z)=(X+Y).(X+Z) প্রমাণিত।

৫। (ক) যখন X=0 তখন 0+0ʹ=0+1=1 আবার যখন X=1 তখন 1+1ʹ=1+0=1 সুতরাং X এর সকল মানের জন্য X+X̅=1 প্রমাণিত।

(ক) যখন X=0 তখন 0.0ʹ=0.1=0 আবার যখন X=1 তখন 1.1ʹ=1.0=0 সুতরাং X এর সকল মানের জন্য X.X̅=0 প্রমাণিত।

৬। টু-ভ্যাল্যূড বুলিয়ান বীজগণিতের ক্ষেত্রে কেবল দুটি নির্দিষ্ট উপাদান 0 এবং 1 আছে যেখানে 0≠1, সুতরাং টু-ভ্যাল্যূড বুলিয়ান বীজগণিতের ক্ষেত্রে Huntington এর ৬নং Postulate সিদ্ধ।

দ্বৈত নীতি (Duality):

লক্ষ্য করলে দেখা যায় হান্টিংটনের স্বতঃসিদ্ধসমূহ জোড়ায় জোড়ায় পার্ট-(ক) এবং পার্ট-(খ) তে উপস্থাপিত। এদের বাইনারী অপারেটর এবং Identity Element পরস্পরের মাঝে বদল করে অপর বৈধ সমীকরণটি পাওয়া যায়। বুলিয়ান বীজগণিতের এই গুরুত্ত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যকে দ্বৈত নীতি বা Duality Principle বলা হয়। AND এবং OR অপারেটরের সাথে সম্পর্কযুক্ত সকল বুলিয়ান স্বতঃসিদ্ধ, উপপাদ্য এবং সমীকরণসমূহ দ্বৈত নীতি মেনে চলে। যদি একটি বৈধ সমীকরণ থাকে তবে উহার দুটি বিষয় পরিবর্তন করে অপর বৈধ সমীকরণটি পাওয়া যাবে। উক্ত দুটি বিষয় নিম্নরূপঃ

১। AND এবং OR অপারেটরকে পরস্পর Interchange বিনিময় করে। অর্থাৎ AND (.) এর পরিবর্তে OR (+) এবং OR (+) এর পরিবর্তে AND (.) ব্যবহার করে।

২। ‘0’ এবং ‘1’ লজিকদ্বয়কে পরস্পর Interchange বিনিময় করে। অর্থাৎ ‘0’ এর পরিবর্তে ‘1’ এবং ‘1’ এর পরিবর্তে ‘0’ ব্যবহার করে।

উদাহরণসরূপঃ 1+1=1 এই সমীকরণে দ্বৈত নীতি ব্যবহার করে পাই 0.0 = 0 সুতরাং এই সমীরণও বৈধ। অনুরূপঃ AB+AB̅=A সমীকরণে দ্বৈত নীতি ব্যবহার করে পাই (A+B).(A+B̅)=A এই সমীরণও বৈধ।

হান্টিংটনের স্বতঃসিদ্ধসমূহ দ্বৈত নীতি মেনে চলে –

হান্টিংটনের ২য় স্বতঃসিদ্ধে রয়েছে X+0 = 0+X = X ইহাতে দ্বৈত নীতি প্রয়োগ করে পাই X.1 = 1.X = X যা উক্ত জোড়ের অপর সমীকরণ।

হান্টিংটনের ৩য় স্বতঃসিদ্ধে বা বিনিময় সূত্রে রয়েছে X+Y = Y+X ইহাতে দ্বৈত নীতি প্রয়োগ করে পাই X.Y = Y.X যা উক্ত জোড়ের অপর সমীকরণ।

সুতরাং হান্টিংটনের স্বতঃসিদ্ধসমূহ দ্বৈত নীতি মেনে চলে।

ভেনচিত্র (Venn Diagram):

V_D2VENN_D_11880 সালে ইংরেজ যুক্তিবিদ (John Venn) জন ভেন Eulerian Circle নামে একটি বিশেষ ধরণের চিত্র পদ্ধতি উপস্থাপন করেন যা বর্তমানে বুলিয়ান এক্সপ্রেশনসমূহ ব্যাখ্যা ও অনুধাবনের জন্য খুবই সহায়ক। পরবর্তীতে তার এই চিত্রটি ভেনচিত্র বা Venn Diagram নামে ডাকা হয়। এই চিত্রে একটি আয়তক্ষেত্রের মাঝে কতকগুলি উপরিপাতিত বৃত্তক্ষেত্র অংকিত থাকে। প্রতিটি বৃত্তক্ষেত্র একটি লজিক্যাল চলকের প্রতিনিধিত্ব করে, অর্থাৎ প্রতিটি বৃত্তক্ষেত্রকে একটি করে লজিক্যাল চলক দ্বারা সংগায়িত করা হয়। বৃত্তের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রকে উক্ত চলকের নামে ডাকা হয় এবং বাহিরের ক্ষেত্রকে উক্ত চলকের কমপ্লিমেন্ট নামে ডাকা হয়। যেমনঃ চিত্রে বৃত্তের অভ্যন্তরের অংশ X হলে বাহিরের অংশ X̅ বা বৃত্তের অভ্যন্তরের ক্ষেত্র X=1 হলে বাহিরের অংশ X̅=0 হবে। আয়তক্ষেত্রের অভ্যন্তরে দুটি উপরিপাতিত চলকের ক্ষেত্রে চারটি পৃথক ক্ষেত্র পাওয়া যায়। X এবং Y উভয়ের বহির্ভূত অংশ X̅ Y̅। X এর অভ্যন্তরে কিন্তু Y এর বহির্ভূত তা XY̅। আবার Y এর অভ্যন্তরে কিন্তু X এর বহির্ভূত তা X̅Y উভয় বৃত্তের Overlamping অংশ XY উভয় বৃত্তের মোট ক্ষেত্র X+Y দ্বারা সংগায়িত।

VD4VD3X+XY=X স্বতঃসিদ্ধটি ভেনচিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করতে চাইলে চিত্র-খ এর মত দুই বৃত্ত বিশিষ্ট ভেনচিত্র প্রয়োজন। চিত্র-খ দেখলে দেখা যায় XY ক্ষেত্র বৃত্তক্ষেত্র X এর অন্তর্ভূক্ত সুতরাং X+XY=X প্রমাণিত।

আবার বিতরণ সূত্র X(Y+Z)=XY+XZ এর ক্ষেত্রে ভেনচিত্রে তিনটি উপরিপাতিত বৃত্তক্ষেত্র XYZ আছে যাতে আটটি পৃথক ক্ষেত্র আছে এবং এতে XY+XZ ক্ষেত্র X(Y+Z) ক্ষেত্রের সমান যা চিত্র-গ এবং চিত্র-ঘ এ দেখানো হয়েছে। সুতরাং X(Y+Z)=XY+XZ প্রমাণিত।

ডি-মরগ্যানের উপপাদ্যঃ

বুলীয় বীজগণিত প্রবর্তনের পর অনেক গণিতবিদ একে হাস্যকর অভিহিত করেছিলেন। বুলীয় বীজগণিতের আপাত সরলতাই ছিল এই হাস্যরসের কারন। তখন ইংরেজ গণিতবিদ Augustus De Morgan বুলীয় বীজগণিত নিয়ে বিস্তর গবেষণা করে প্রয়োজনীয় দুটি উপপাদ্য প্রতিষ্ঠা করেন। যা লজিক সরলীকরনের জন্য ডিজিটাল ইলেকট্রনিক্সে বহুল ব্যবহৃত উপপাদ্য। উপপাদ্য দুটির বিবৃতি নিম্নরূপঃ

DEMORGAN
ডি-মরগ্যান

প্রথম উপপাদ্যঃ কোন বুলিয়ান এক্সপ্রেশনের চলকসমূহের লজিক্যাল অর অপারেশনের কমপ্লিমেন্ট উক্ত চলকসমূহের কমপ্লিমেন্ট মানের লজিক্যাল এন্ড অপাপরেশনের সমান। যেমনঃ কোন বুলিয়ান এক্সপ্রেশনের দুটি চলক X এবং Y হলে (X+Y)′=X′.Y′ হবে। অনুরূপঃ N সংখ্যক চলকের ক্ষেত্রে (X1+X2+ …….. +XN)́ = X1́.X2́…….. XŃ হবে।

দ্বিতীয় উপপাদ্যঃ কোন বুলিয়ান এক্সপ্রেশনের চলকসমূহের লজিক্যাল এন্ড অপারেশনের কমপ্লিমেন্ট উক্ত চলকসমূহের কমপ্লিমেন্ট মানের লজিক্যাল অর অপাপরেশনের সমান। যেমনঃ কোন বুলিয়ান এক্সপ্রেশনের দুটি চলক X এবং Y হলে (X.Y)́= X́+Ý হবে। অনুরূপঃ N সংখ্যক চলকের ক্ষেত্রে (X1.X2. …….. .XN)́ = X1́+X2́+…….. +XŃ হবে।

প্রমাণঃ দুই চলকের জন্য বুলিয়ান বীজগণিতের প্রমাণ Truth টেবিলের মাধ্যমে দেখানো হলোঃ

De-Morgan's

উপরের Truth টেবিল হতে দেখা যায় X এবং Y এর সকল মানের ক্ষেত্রে (X+Y)′=X′.Y′ হয় এবং (X.Y)′= X′+Ý′ হয়। অনুরূপঃ N সংখ্যক চলকের ক্ষেত্রে দেখানো যায় (X1+X2+ …….. +XN)́ = X1́.X2́…….. XŃ এবং (X1.X2. …….. .XN)́ = X1́+X2́+…….. +XŃ প্রমাণিত।

বুলিয়ান বীজগণিতের মৌলিক স্বতঃসিদ্ধ ও উপপাদ্যসমূহের তালিকাঃ

১। (ক) X+0 = 0+X = X (খ) X.1 = 1.X = X
২। বিনিময় সূত্রঃ (ক) X+Y = Y+X (খ) X.Y = Y.X
৩। বিতরণ সূত্রঃ (ক) X+(Y.Z)=(X+Y).(X+Z) (খ) X.(Y+Z)=(X.Y)+(X.Z)
৪। (ক) X+X′=1 এবং (খ) X.X′=0
৫। অনুসংগ সূত্রঃ (ক) X+(Y+Z)=(X+Y)+Z=Y+X+Z (খ) X.(Y.Z)=(X.Y).Z=Y.X.Z

সূত্রঃ

[1] Wikipedia
[2] Digital Logic and Computer Design – M. Morris Mano
[3] Digital Principles and Logic Design – A. SAHA and N. MANNA
[4] উচ্চ মাধ্যমিক কম্পিউটার শিক্ষা প্রথম পত্র – প্রকৌশলী মুজিবুর রহমান।

Share this post

Post Comment