ডিসি পাওয়ার সরবরাহ

.

সূচনাঃ

ইলেকট্রনিক টেকনোলজিতে ডিসি পাওয়ার সরবরাহ একটি পরিচিত নাম। ইহা বহুল ব্যবহৃত একটি ইলেকট্রনিক বর্তনী অথবা উৎস। প্রায় ইলেকট্রনিক ডিভাইসে ডিসি পাওয়ার সরবরাহের ব্যবহার রয়েছে। সুতরাং এ সম্পর্কে জানা ইলেকট্রনিক্সের শিক্ষার্থীদের জন্য অপরিহার্য।

৪.১। পরিচয়ঃ

আধুনিক ডিসি পাওয়ার সরবরাহ
আধুনিক ডিসি পাওয়ার সরবরাহ

ডিসি পাওয়ার সরবরাহ একটি বিশেষ ধরণের ইলেকট্রনিক বর্তনী অথবা উৎস যা হতে ডিসি পাওয়ার সরবরাহ পাওয়া যায়। কোন ইলেকট্রনিক লোডের জন্য ইহা ডিসি পাওয়ার ইউনিট হিসাবে কাজ করে। উদাহরণসরূপ ড্রাইসেল, ব্যাটারী, ডিসি জেনারেটর, ফটোভোল্টাইক সেল, অথবা ট্রান্সফর্মারের এসি ভোল্টেজকে ডিসিতে রূপান্তর করার বর্তনীসমূহ (রেকটিফায়ার, ফিল্টার, স্ট্যাবিলাইজার) ইত্যাদি সবগুলি ডিসি পাওয়ার সরবরাহের উদাহরণ।

৪.৪.১। প্রতীকঃ

স্ক্যামিটিক প্রতীক
স্ক্যামিটিক প্রতীক

অধিকাংশ ইলেকট্রনিক বর্তনীর স্ক্যামিটিক ডায়াগ্রামে চিত্রের মত ডিসি সরবরাহের চিত্র দেয়া থাকে এটি ডিসি সরবরাহের প্রতীক। নূন্যতম দুটি প্লেট বা ইলেকট্রোড দিয়ে একটি ডিসি সরবরাহ প্রকাশ করা হয় যার প্রত্যেক প্লেটের সাথে একটি করে সংযোগ টার্মিনাল যুক্ত থাকে। ছোট প্লেটটির সাথে যুক্ত টার্মিনাল ঋণাত্বক এবং বড় প্লেটটির সাথে যুক্ত টার্মিনাল ধণাত্বক প্রান্ত হিসাবে বিবেচিত। ডিসি পাওয়ার সরবরাহে সর্বদা জোড় সংখ্যক প্লেট থাকবে। দুইয়ের অধিক প্লেট থাকলে সাধারণতঃ একাধিক সেলের সমন্বয় বা ব্যাটারীর সমন্বয় বুঝায়, এক্ষেত্রে সোর্সটির ভোল্টেজ উচ্চ হতে পারে।

৪.৪.২। প্রকারভেদঃ

উৎসের ধরণ অনুযায়ী ডিসি সরবরাহ দুই ধরণের হয়ে থাকে ১) সোর্স ও ২) কনভার্টার

১) সোর্সঃ এগুলি ডিসি ভোল্টেজের স্বতন্ত্র উৎস যেমনঃ বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যূতিক সেল এবং ব্যাটারী, এছাড়া রয়েছে ডায়নামো বা ডিসি জেনারেটর ইত্যাদি।

২) কনভার্টারঃ কনভার্টার বর্তনীর মাধ্যমে ডিসি সরবরাহ প্রস্তুত করা যায় যেখানে কনভার্টার ইউনিটটি একটি ডিসি উৎস হিসাবে কাজ করে। এধরনের ডিসি উৎস বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। এ ধরণের কনভার্টারসমূহে সাধারণতঃ উচ্চ ভোল্টেজে ২২০ ভোল্ট এসি গ্রহন করে নিম্ন ভোল্টেজের সাধারণতঃ ০~‍‍৩০ ভোল্ট ডিসিতে রূপান্তরের ব্যবস্থা থাকে, এবং একই সাথে ভোল্টেজ রেগুলেশনের ব্যবস্থাও থাকে।

আউটপুট ভোল্টেজের ধরণ অনুযায়ী ডিসি সরবরাহ দুই প্রকার ১) রেগুলেটেড এবং ২) নন-রেগুলেটেড সরবরাহ।

১) রেগুলেটেড সরবরাহঃ

রেগুলেটেড সরবরাহগুলির আউটপুট ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রনযোগ্য। এ ধরণের সরবরাহে পটেনশিওমিটারের শ্যাফ্‌ট ঘুরিয়ে আউটপুট ভোল্টেজের মান নিয়ন্ত্রন করা যায় এবং যে মানে আউটপুট ভোল্টেজ সেট করা হয় সে মানেই স্থির থাকে।

২) নন-রেগুলেটেড সরবরাহঃ

নন-রেগুলেটেড সরবরাহগুলির আউটপুট ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রন যোগ্য নয়।

৪.২। প্রয়োজনীয়তাঃ

অধিকাংশ ইলেকট্রনিক বর্তনী পরিচালনা করতে ডিসি পাওয়ার সরবরাহের প্রয়োজন হয়। কিছু কিছু ডিভাইস সরাসরি এসি প্রবাহের সাথে যুক্ত করে পরিচালনা করা হয়, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তা এসি প্রবাহ দ্বারা পরিচালিত হয় বরং তা মূল বর্তনীতে প্রয়োগের পূর্বেই রেকটিফায়ার সার্কিটের মাধ্যমে ডিসি প্রবাহে রূপান্তর করে নেয়া হয়। ইলেকট্রনিক বর্তনীসমূহ সোর্স হতে এনার্জি গ্রহন করে তা রূপান্তর ও বিভিন্ন প্রকৃয়ার মাধ্যমে কাংখিত আউটপুট প্রদান করে। ডিসি পাওয়ার সোর্স হলো সঞ্চিত শক্তির আধার যা ছাড়া ইলেকট্রনিক ডিভাইস বা বর্তনীসমূহ পরিচালিত হতে পারে না। আধুনিক ইলেকট্রনিক ল্যাবরেটরীতে বিভিন্ন পরীক্ষনে বিভিন্ন মানের স্থির ও নিয়ন্ত্রনযোগ্য ডিসি সরবরাহের প্রয়োজন হয়। এ কাজের সুবিধার জন্য বর্তমানে রেগুলেটেড ডিসি সরবরাহ পাওয়া যায়, যার মাধ্যমে পরীক্ষণ সার্কিটের চাহিদানূযায়ী উপযুক্ত ডিসি ভোল্টেজ সরবরাহ করা যায়।

৪.৩। রেকটিফিকেশন এবং রেকটিফায়ার কি?

এসি ভোল্টেজকে ডিসি ভোল্টেজে রূপান্তরের প্রকৃয়াকে রেকটিফিকেশন বলা হয় এবং যে বর্তনীর মাধ্যমে রেকটিফিকেশনের কার্য সমাধা করা হয় তা রেকটিফায়ার। রেকটিফায়ার দুই ধরনেরঃ ১) হাফ ওয়েভ রেকটিফায়ার এবং ২) ফুল ওয়েভ রেকটিফায়ার। রেকটিফায়ার সার্কিটে এক বা একাধিক ডায়োড ব্যবহার হয় এবং এর আউটপুটে পালসেটিং ডিসি পাওয়া যায়। পালসেটিং ডিসিকে রিপল মুক্ত করার জন্য ফিল্টার সার্কিট ব্যবহার করা হয়।

৪.৮। একটি আদর্শ রেগুলেটেড ডিসি পাওয়ার সরবরাহ ব্লক ডায়াগ্রামসহ বর্ণনাঃ

রেগুলেটেড ডিসি পাওয়ার সরবরাহের ব্লক ডায়াগ্রাম নিম্নে দেয়া হলোঃ

ব্লক ডায়াগ্রাম
ব্লক ডায়াগ্রাম

ট্রান্সফর্মারঃ এটি ডিসি পাওয়ার সরবরাহের প্রাথমিক ধাপ এর মাধ্যমে উচ্চতর বিভবের এসি ভোল্টেজ নিম্ন বিভবের এসি বিভবে পরিনত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি স্টেপ-ডাউন ট্রান্সফর্মার। এর প্রাইমারী উচ্চ বিভবে নিম্ন কারেন্টে এসি পাওয়ার গ্রহন করে এবং সেকেন্ডারী নিম্ন বিভবে উচ্চ কারেন্টে এসি পাওয়ার প্রদান করে।

রেকটিফায়ারঃ রেকটিফায়ার একটি বিশেষ ধরনের সার্কিট যা এর ইনপুটে এসি ভোল্টেজ গ্রহন করে এবং তা রূপান্তরের মাধ্যমে ডিসি ভোল্টেজে পরিনত করে। রেকটিফায়ার হাফ ওয়েভ এবং ফুল ওয়েভ দুই ধরণের হতে পারে। হাফ এয়ভ রেকটিফায়ারে একটি এবং ফুল ওয়েভ সেন্টার ট্যাপ রেকটিফায়ারে দুটি এবং ফুল ওয়েভ ব্রীজ রেকটিফায়ারে চারটি ডায়োড ব্যবহৃত হয়। রেকটিফায়ার অংশ ট্রান্সফর্মার হতে এসি ভোল্টেজ গ্রহন করে তাকে ডিসি ভোল্টেজে রূপান্তর করে।

ফিল্টারঃ রেকটিফায়ারের আউটপুটে ডিসি ভোল্টেজ পাওয়া যায় কিন্তু তা বিষুদ্ধ ডিসি নয়, বরং পালসেটিং ডিসি। এতে প্রচুর পরিমানে রিপল থাকে যা বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। আবার পালসেটিং ডিসির কারনে সংবেদনশীল ও সূক্ষ পরীক্ষণ সার্কিটের আউটপুট ওয়েভ আকৃতি কাংক্ষিত মানে না আসতে পারে। এ সকল ত্রুটির জন্য রেকটিফায়ারের আউটপুটকে ফিল্টার করে রিপল দুর করা হয়। তাতে মোটামুটি বিষুদ্ধ ডিসি পাওয়া সম্ভব কিন্তু ১০০% বিষুদ্ধ ডিসি পাওয়া সম্ভব নয়। ফিল্টার অংশে বিশেষ ধরনের সার্কিট ব্যবহার করা হয় যা ফিল্টার সার্কিট নামে পরিচিত। সাধারণতঃ রেকটিফায়ারের আউটপুটে লো-পাস ফিল্টার সার্কিট ব্যবহার করা হয় যা কখনো সিরিজ ইন্ডাকটর, কখনো শান্ট ক্যাপাসিটর এবং কখনো কখনো সিরিজ ইন্ডাকটর এবংশান্ট ক্যাপাসিটরের সমন্বয়ে গঠিত।

ভোল্টেজ রেগুলেটরঃ ফিল্টার সার্কিটের আউটপুটে মোটামুটি রিপল-ফ্রি ডিসি ভোল্টেজ পাওয়া যায় কিন্তু তা রেগুলেটেড ডিসি নয়। ট্রান্সফর্মারের প্রাইমারী ভোল্টেজের পরিবর্তন সাপেক্ষে সেকেন্ডারী ভোল্টেজ পরিবর্তন হয় এবং সেই সাথে রেকটিফায়ারের আউটপুট ও ফিল্টার সাকর্কিটের আউটপুট ভোল্টেজেরও পরিবর্তন হয়ে থাকে। এরূপ ভোল্টেজের ওঠানামা ইলেকট্রনিক লোডের জন্য ক্ষতির কারন হতে পারে। শুধু তাই নয় এরূপ ডিসি সোর্সের সাহায্যে ল্যবরেটরীতে পরীক্ষণ করলে পরীক্ষণ বর্তনীর আউটপুট ওয়েভ সেপ কাংক্ষিত মানে পাওয়া যাবেনা ফলে ভুল রিডিং আসতে পারে। এ সকল ত্রুটি দুর করার জন্য ফিল্টার সার্কিটের আউটপুটে রেগুলেটর সার্কিট সংযোগ করা হয় যার ফলে একটি ডিসি সরবরাহের আউটপুটে স্থির মানের ডিসি পাওয়া যায়। রেগুলেটর সার্কিটে সাধারণতঃ সিরিজ রেজিস্টর এবং শান্ট জেনার ডায়োড বেশী ব্যবহার হয়ে থাকে। বর্তমান সময়ে সেমিকন্ডাকটর নির্মিত বিভিন্ন আইসি ব্যবহৃত হয় যেগুলি একই সাথে রেগুলেটর এবং ভোল্টেজ ডিভাইডার হিসাবে কাজ করে।

ভোল্টেজ ডিভাইডারঃ ভোল্টেজ রেগুলেটরের আউটপুটে প্রাপ্ত স্থির ডিসিকে লোডের চাহিদানুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন ভোল্টেজ রেঞ্জে সেট করার জন্য ভোল্টেজ ডিভাইডার সার্কিট ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে কিছু রেজিস্টরকে ভোল্টেজ রেগুলেটরের আউটপুটে সিরিজে যুক্ত করে পর পর দুটি রেজিস্টরের মাঝখান হতে ট্যাপিং বের করা হয়। তবে বর্তমানে এই পদ্ধতির ব্যবহার কমে এসেছে। বর্তমানে সেমিকন্ডাকটর নির্মিত বিভিন্ন রেগুলেটর আইসি ব্যবহৃত হয় যেগুলি একই সাথে রেগুলেটর এবং ভোল্টেজ ডিভাইডার হিসাবে কাজ করে। একটি পটেনশিওমিটারের সাহায্যে রেগুলেটর আইসির বায়াস পরিবর্তন করে আউটপুট ভোল্টেজ পরিবর্তন/নিয়ন্ত্রন করা যায়।

সূত্রঃ

Principles of Electronics – V. K. Mehta
Basic Electronics Solod State – B. L. Theraja

Share this post

Post Comment